টিকটক চুক্তি নিয়ে আইন মেনে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান চায় চীন
ভিডিও শেয়ারিং অ্যাপ টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম হস্তান্তর সংক্রান্ত চুক্তি নিয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করেছে চীন। বেইজিং জানিয়েছে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো যেন চীনের আইন ও বিধিমালা মেনে, সব পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করে ভারসাম্যপূর্ণ সমাধানে পৌঁছায়। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি চীনা কোম্পানিগুলোর জন্য ন্যায্য ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দেশটি।
আজ বৃহস্পতিবার বেইজিংয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়ংচিয়ান এ মন্তব্য করেন। তাঁকে টিকটকের যুক্তরাষ্ট্রের কার্যক্রম হস্তান্তর নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, কোম্পানিগুলোর উচিত আইনসম্মত কাঠামোর ভেতরে থেকে এমন সমাধান খোঁজা, যা সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের স্বার্থের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে।
রয়টার্স জানায়, টিকটকের চীনা মালিকানা প্রতিষ্ঠান বাইটড্যান্স গত সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটকের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ হস্তান্তরের বিষয়ে একটি আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক চুক্তি সই করেছে। এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কয়েকটি বিনিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান যাদের মধ্যে প্রযুক্তি জায়ান্ট ওরাকলও রয়েছে টিকটকের মার্কিন কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নেবে। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রে টিকটক নিষিদ্ধ হওয়ার সম্ভাবনা অনেকটাই কমে আসবে বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হে ইয়ংচিয়ান বলেন, “আমরা আশা করি, যুক্তরাষ্ট্র চীনের সঙ্গে একই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগোবে এবং নিজেরা যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তা আন্তরিকভাবে পালন করবে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি ন্যায্য, উন্মুক্ত, স্বচ্ছ ও বৈষম্যহীন ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করবে।”

টিকটক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের টানাপোড়েন নতুন নয়। জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরেই টিকটকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আসছে। মার্কিন কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, টিকটকের মাধ্যমে ব্যবহারকারীদের ব্যক্তিগত তথ্য চীনা সরকারের হাতে যেতে পারে। যদিও বাইটড্যান্স এবং চীনা সরকার বারবার এ অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে।
এই প্রেক্ষাপটে টিকটকের মার্কিন কার্যক্রম আলাদা করে দেওয়ার উদ্যোগকে অনেকেই দুই দেশের মধ্যে চলমান প্রযুক্তিগত উত্তেজনা প্রশমনের একটি কৌশল হিসেবে দেখছেন। তবে চীনের আইন অনুযায়ী, গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি ও অ্যালগরিদম সংক্রান্ত বিষয়ে সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। ফলে টিকটক চুক্তির বাস্তবায়ন কেবল ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তেই সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে চীনের নীতিগত ও কৌশলগত বিবেচনাও।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই চুক্তি সফলভাবে বাস্তবায়িত হলে তা শুধু টিকটকের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং চীন–যুক্তরাষ্ট্র প্রযুক্তি সম্পর্কের ক্ষেত্রেও একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারে। অন্যদিকে, যদি দুই দেশের অবস্থানের মধ্যে বড় ধরনের ফারাক থেকে যায়, তবে চুক্তির পথে নতুন জটিলতাও তৈরি হতে পারে।
চীনের বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বেইজিং এই চুক্তিকে পুরোপুরি বেসরকারি কোম্পানির সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখছে না। বরং তারা চাইছে, আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক লেনদেন যেন সংশ্লিষ্ট দেশের আইন, নীতি ও সার্বভৌম স্বার্থের প্রতি সম্মান দেখিয়েই সম্পন্ন হয়।
বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর প্ল্যাটফর্ম টিকটক এখন শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে ভূরাজনীতি, প্রযুক্তি নিরাপত্তা ও বৈশ্বিক বাণিজ্যনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক। টিকটক চুক্তির ভবিষ্যৎ তাই নির্ভর করছে শুধু কোম্পানিগুলোর সমঝোতার ওপর নয়, বরং চীন ও যুক্তরাষ্ট্র, এই দুই পরাশক্তির পারস্পরিক সম্পর্কের গতিপথের ওপরও।






