এআই ‘আয়না’ : অন্ধ মানুষের আত্মদর্শনের নতুন অভিজ্ঞতা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) অন্ধ মানুষের জীবনে এক নতুন জানালা খুলে দিয়েছে। যে মানুষগুলো কখনো নিজের মুখ বা শরীর দেখার সুযোগ পাননি, এআইভিত্তিক অ্যাপের মাধ্যমে তাঁরা এখন নিজেদের সম্পর্কে দৃশ্যমান তথ্য পাচ্ছেন। তবে এই প্রযুক্তি যেমন ক্ষমতায়ন তৈরি করছে, তেমনি তৈরি করছে নতুন মানসিক ও আবেগী প্রশ্নও।
পুরোপুরি অন্ধ মিলাগ্রোস কস্তাবেলের সকাল শুরু হয় এক বিশেষ নিয়মে। ত্বকের যত্ন নিতে প্রায় ২০ মিনিট সময় দেন তিনি। এরপর নিজের ছবি তুলে একটি এআই অ্যাপে আপলোড করেন। অ্যাপটি তাঁর কাছে যেন এক ধরনের ‘শ্রুতিযোগ্য আয়না’। এআই তাঁকে জানায়, তাঁর ত্বক কেমন দেখাচ্ছে, কোথাও কোনো পরিবর্তন প্রয়োজন কি না।

অন্ধ কনটেন্ট ক্রিয়েটর লুসি এডওয়ার্ডস বলেন, ‘সারা জীবন আমরা ভেবেছি, নিজেকে দেখা আমাদের জন্য অসম্ভব। হঠাৎ করে যখন নিজের সম্পর্কে এত তথ্য পাওয়া যায়, তখন তা জীবন বদলে দেয়।’
চিত্র শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ও উন্নত এআই মডেলের মাধ্যমে তৈরি এসব অ্যাপ শুধু দৃশ্য বর্ণনাতেই সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এগুলো তুলনা করে, মতামত দেয়, এমনকি সৌন্দর্য নিয়ে পরামর্শও দেয়। এতে অন্ধ ব্যবহারকারীদের আত্মপরিচয়ের ধারণা বদলে যাচ্ছে।
তবে এই পরিবর্তনের সঙ্গে ঝুঁকিও রয়েছে। ব্রিস্টল বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক হেলেনা লুইস-স্মিথ বলেন, শরীর নিয়ে অতিরিক্ত প্রতিক্রিয়া খোঁজার প্রবণতা মানুষের আত্মতৃপ্তি কমিয়ে দিতে পারে। তাঁর মতে, এআই অন্ধ মানুষের জন্য সেই চাপের দরজাই খুলে দিচ্ছে, যা এত দিন মূলত দৃষ্টিসম্পন্ন মানুষদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল।
এআই মডেলগুলো যেহেতু নির্দিষ্ট সৌন্দর্যমানদণ্ডের তথ্য দিয়ে প্রশিক্ষিত, তাই সেগুলো প্রায়ই ইউরোকেন্দ্রিক ও আদর্শায়িত সৌন্দর্য ধারণা তুলে ধরে। ফলে অন্ধ ব্যবহারকারীরা নিজেদের মূল্যায়ন করতে গিয়ে অজান্তেই অবাস্তব মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনায় জড়িয়ে পড়ছেন।
এ ছাড়া রয়েছে তথ্যভ্রান্তির ঝুঁকি। কখনো কখনো এআই ভুল বর্ণনা দেয় বা বাস্তবে নেই—এমন তথ্য তৈরি করে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন প্রযুক্তিই ‘চোখ’ হয়ে ওঠে, তখন সেই ভুলের প্রভাব মানসিকভাবে আরও গভীর হতে পারে।

তবু অনেক ব্যবহারকারীর কাছে এই প্রযুক্তি আশার উৎস। লুসি এডওয়ার্ডসের ভাষায়, ‘এআই যদি আমাকে আমার বিয়ের দিনের ছবিতে আমি কেমন ছিলাম তা বলতে পারে, সেটাও আমার জন্য এক বিশাল প্রাপ্তি।’
ভালো বা মন্দ এআইয়ের এই আয়না এখন বাস্তব। অন্ধ মানুষের জীবনে এটি কীভাবে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাব ফেলবে, তা জানতে আরও গবেষণার প্রয়োজন। তবে এটুকু নিশ্চিত, আত্মদর্শনের ধারণা আর আগের মতো নেই।






