প্রযুক্তি সংবাদ

কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রস্তাব, ভারতে নতুন বিতর্ক

5/5 - (1 vote)

ভারতে কিশোরদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করার একটি প্রস্তাব নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জোটসঙ্গী দল তেলুগু দেশম পার্টির (টিডিপি) এক সংসদ সদস্য এ বিষয়ে একটি বিল উত্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্য ও ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে যখন নতুন করে বিতর্ক চলছে, তখন ভারতের এই প্রস্তাব সেই বৈশ্বিক আলোচনার সঙ্গেই যুক্ত হয়েছে।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে টিডিপির সাংসদ এলএসকে দেবরায়ালু বলেন, ‘আমাদের শিশুরা শুধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তই হচ্ছে না, ভারত বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য বিশ্বের অন্যতম বড় ডেটা উৎপাদনকারী দেশ হয়ে উঠেছে।’ তাঁর ভাষায়, এই ডেটা ব্যবহার করেই বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবস্থা গড়ে তুলছে, অথচ এর কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সুফল পাচ্ছে অন্য দেশগুলো।

কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রস্তাব, ভারতে নতুন বিতর্ক
কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রস্তাব, ভারতে নতুন বিতর্ক

কী বলা হয়েছে প্রস্তাবিত বিলে

১৫ পৃষ্ঠার এই প্রস্তাবিত বিলটির নাম সোশ্যাল মিডিয়া (এজ রেস্ট্রিকশনস অ্যান্ড অনলাইন সেফটি) বিল। বিলটি এখনো প্রকাশ্যে আসেনি, তবে রয়টার্স সেটির একটি কপি পর্যালোচনা করেছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৬ বছরের নিচে কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট খুলতে, পরিচালনা করতে বা ব্যবহার করতে পারবে না। যদি কেউ এই নিয়ম ভঙ্গ করে, সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে সেই অ্যাকাউন্ট বন্ধ করে দিতে হবে।

দেবরায়ালু জোর দিয়ে বলেন, বয়স যাচাইয়ের পুরো দায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপরই থাকা উচিত।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিশোরদের প্রবেশাধিকার সীমিত করার বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে একাধিক দেশ উদ্যোগ নিয়েছে। গত মাসে অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের নিচে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করে বিশ্বে প্রথম দেশ হিসেবে নজির গড়েছে। ফ্রান্সের জাতীয় পরিষদও ১৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য এমন নিষেধাজ্ঞার পক্ষে ভোট দিয়েছে। যুক্তরাজ্য, ডেনমার্ক ও গ্রিসেও বিষয়টি নিয়ে নীতিগত আলোচনা চলছে।

তবে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর আপত্তিও রয়েছে। মেটা (ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান) আগেই জানিয়েছে, তারা অভিভাবকীয় নজরদারির পক্ষে, কিন্তু সরাসরি নিষেধাজ্ঞা দিলে কিশোররা আরও অনিরাপদ ও অনিয়ন্ত্রিত প্ল্যাটফর্মের দিকে ঝুঁকতে পারে।

কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রস্তাব, ভারতে নতুন বিতর্ক
কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের প্রস্তাব, ভারতে নতুন বিতর্ক

ভারতের অবস্থান

ভারত বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্মার্টফোন বাজার। দেশটিতে প্রায় ৭৫০ মিলিয়ন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী এবং প্রায় ১০০ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। এত বড় বাজার হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে ভারতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের জন্য কোনো নির্দিষ্ট ন্যূনতম বয়সসীমা নেই।

ভারতের তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য করেনি। তবে সম্প্রতি দেশটির প্রধান অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ‘ডিজিটাল আসক্তি’ মোকাবিলায় বয়সভিত্তিক সীমা নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বিলের রাজনৈতিক গুরুত্ব

দেবরায়ালুর উত্থাপিত বিলটি একটি প্রাইভেট মেম্বারস বিল অর্থাৎ এটি সরাসরি সরকারের পক্ষ থেকে আনা হয়নি। তবু এমন বিল অনেক সময় সংসদে বিস্তৃত আলোচনা সৃষ্টি করে এবং ভবিষ্যৎ আইন প্রণয়নে প্রভাব ফেলে। তেলুগু দেশম পার্টি অন্ধ্রপ্রদেশের ক্ষমতাসীন দল এবং কেন্দ্রীয় সরকারে মোদির জোটের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় এই প্রস্তাবকে একেবারে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

সব মিলিয়ে, কিশোরদের অনলাইন নিরাপত্তা, ডেটা সার্বভৌমত্ব ও প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ—এই তিনটি বড় প্রশ্নকে সামনে এনে ভারতের এই প্রস্তাব দেশটির ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন বিতর্কের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Related Articles

Back to top button