গুগল ছাড়লেন নোয়াম শাজির, যোগ দিলেন ওপেনএআইয়ে
গুগল ছাড়লেন নোয়াম শাজির, যোগ দিলেন ওপেনএআইয়ে । শেয়ারবাজারে অভিষেকের প্রস্তুতির মধ্যেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও নীতিনির্ধারণ খাতে দুই প্রভাবশালী ব্যক্তিকে নিয়োগ দিল ওপেনএআই

প্রযুক্তি ডেস্ক: সম্ভাব্য শেয়ারবাজারে (আইপিও) অভিষেকের প্রস্তুতির মধ্যেই নিজেদের নেতৃত্ব আরও শক্তিশালী করতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়োগ দিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) গবেষণা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই। প্রতিষ্ঠানটিতে যোগ দিচ্ছেন গুগল ডিপমাইন্ডের কিংবদন্তি এআই গবেষক নোয়াম শাজির এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক হোয়াইট হাউস এআই নীতিবিষয়ক কর্মকর্তা ডিন বল। প্রযুক্তিবিষয়ক সংবাদমাধ্যম টেকক্রাঞ্চের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
নোয়াম শাজির আধুনিক জেনারেটিভ এআই প্রযুক্তির অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে পরিচিত। তিনি গুগলের জেমিনি প্রকল্পের সহ-নেতা ছিলেন এবং এআইভিত্তিক চরিত্রনির্ভর চ্যাটবট স্টার্টআপ ক্যারেক্টার এআইয়ের সহ-প্রতিষ্ঠাতাও। বুধবার তিনি গুগল ছাড়ার ঘোষণা দেন। ২০০০ সাল থেকে দীর্ঘ সময় গুগলে কাজ করা শাজির কেবল তিন বছরের জন্য প্রতিষ্ঠানটি ছেড়েছিলেন, যখন তিনি ক্যারেক্টার এআই প্রতিষ্ঠা করেন।
দুই বছর আগে গুগল প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের একটি চুক্তির মাধ্যমে শাজিরকে পুনরায় দলে ফিরিয়ে আনে এবং একই সঙ্গে ক্যারেক্টার এআইয়ের প্রযুক্তিগত সক্ষমতারও প্রবেশাধিকার পায়। তবে এবার তিনি ওপেনএআইয়ে যোগ দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রতিযোগিতামূলক বাজারে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছেন।
নোয়াম শাজিরকে আধুনিক এআই বিপ্লবের অন্যতম স্থপতি বলা হয়। তিনি ২০১৭ সালে প্রকাশিত বহুল আলোচিত গবেষণাপত্র ‘অ্যাটেনশন ইজ অল ইউ নিড’-এর সহলেখক ছিলেন। এই গবেষণাপত্রেই প্রথম ট্রান্সফরমার আর্কিটেকচারের ধারণা তুলে ধরা হয়, যার ভিত্তিতেই বর্তমানে চ্যাটজিপিটি, জেমিনি, ক্লডসহ অধিকাংশ জেনারেটিভ এআই মডেল তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুগলে কর্মরত অবস্থায় শাজির কিছু রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতেও আলোচনায় এসেছিলেন। সংবাদমাধ্যম দ্য ইনফরমেশন জানিয়েছে, ট্রান্সজেন্ডার পরিচয় ও গাজা যুদ্ধ নিয়ে অভ্যন্তরীণ বার্তা বোর্ডে তাঁর কিছু মতামত ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ মুছে দিয়েছিল। তবে এসব বিতর্ক ওপেনএআইয়ে তাঁর নতুন দায়িত্বকে কতটা প্রভাবিত করবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
অন্যদিকে, ওপেনএআই নিজেদের নীতিনির্ধারণ ও কৌশলগত সক্ষমতা বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক হোয়াইট হাউস কর্মকর্তা ডিন বলকে নিয়োগ দিয়েছে। গত বছর তিনি সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য হোয়াইট হাউসে দায়িত্ব পালন করেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের এআই অ্যাকশন প্ল্যান প্রকাশে ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি প্রযুক্তিনির্ভর নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফাউন্ডেশন ফর আমেরিকান ইনোভেশন-এ সিনিয়র ফেলো হিসেবে ফিরে যান।
ডিন বল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে জানিয়েছেন, আগামী ৬ জুলাই থেকে তিনি ওপেনএআইয়ের নতুন গঠিত স্ট্র্যাটেজিক ফিউচারস দলের নেতৃত্ব দেবেন। তাঁর ভাষায়, এই দলের প্রধান কাজ হবে প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বকে সীমান্তবর্তী বা অত্যাধুনিক এআই প্রযুক্তি-সংক্রান্ত নীতি নির্ধারণে সহায়তা করা।
ওপেনএআইয়ের প্রধান কৌশল কর্মকর্তা জেসন কওয়নের কাছে সরাসরি জবাবদিহি করবে নতুন দলটি। দলটি বিপর্যয়কর ঝুঁকি, স্ব-উন্নয়নক্ষম এআই, শ্রমবাজারে এআইয়ের প্রভাব এবং এআই গবেষণাগার, সরকার ও সমাজের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করবে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক ও ভবিষ্যৎ নীতিগত সমন্বয়ও তাদের কাজের আওতায় থাকবে।
ডিন বলের মতে, ভবিষ্যতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের সুশাসন ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা অনেকাংশেই এআই প্রতিষ্ঠানগুলোকেই নেতৃত্ব দিতে হবে। তাঁর ভাষায়, অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থা বা ইন্টারনাল গভর্ন্যান্স ভবিষ্যতের এআই ব্যবস্থাপনায় মানুষের ধারণার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

এই নিয়োগ এমন এক সময়ে এলো, যখন ওপেনএআইয়ের অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যানথ্রপিক যুক্তরাষ্ট্র সরকারের চাপের মুখে রয়েছে। গত সপ্তাহে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসন অ্যানথ্রপিকের নতুন মডেল ফেবল ৫ ও মিথোস ৫-এর ওপর রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ নিষেধাজ্ঞা জারি করে। ফলে বিধিনিষেধ এড়াতে প্রতিষ্ঠানটিকে মডেল দুটি পুরোপুরি সরিয়ে নিতে বাধ্য হতে হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নোয়াম শাজির ও ডিন বলকে দলে নেওয়ার মাধ্যমে ওপেনএআই শুধু প্রযুক্তিগত দক্ষতাই বাড়াচ্ছে না, একই সঙ্গে নীতিনির্ধারণ, সরকারি সম্পর্ক এবং ভবিষ্যৎ নিয়ন্ত্রক পরিবেশের জন্যও নিজেদের শক্ত অবস্থানে নেওয়ার চেষ্টা করছে। সম্ভাব্য আইপিওর আগে এই পদক্ষেপ প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘমেয়াদি কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
কেন গুরুত্বপূর্ণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতে গুগল, ওপেনএআই, মেটা ও অ্যানথ্রপিকের মধ্যে প্রতিভা ও নীতিনির্ধারণ নিয়ে প্রতিযোগিতা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে। আধুনিক জেনারেটিভ এআইয়ের অন্যতম উদ্ভাবক নোয়াম শাজির এবং যুক্তরাষ্ট্রের এআই নীতিনির্ধারণে যুক্ত ডিন বলের ওপেনএআইয়ে যোগদান প্রতিষ্ঠানটির প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, নীতিগত প্রভাব এবং সম্ভাব্য আইপিও প্রস্তুতিকে আরও শক্তিশালী করতে পারে।






