প্রতারকেরা নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে, কীভাবে মোকাবিলা করছে লিথিক
প্রতারকেরা নতুন পথ খুঁজে নিচ্ছে, কীভাবে মোকাবিলা করছে লিথিক
ডিজিটাল লেনদেনের নিরাপত্তা বাড়াতে গত কয়েক বছরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। চিপভিত্তিক কার্ড, টোকেন ব্যবস্থার ব্যবহার এবং জৈবিক পরিচয় যাচাইয়ের মতো প্রযুক্তির কারণে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক প্রতারণা কমেছে। তবে প্রতারকেরাও থেমে নেই। একটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে তারা নতুন দুর্বলতা খুঁজে বের করছে।

বর্তমানে তাদের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছে কার্ড সংযুক্তকরণ প্রক্রিয়া। অর্থাৎ, যখন কোনো ব্যবহারকারী নিজের ব্যাংক কার্ড মোবাইল মানিব্যাগে যুক্ত করেন, ঠিক সেই পর্যায়েই প্রতারকেরা হামলা চালানোর চেষ্টা করছে।
এই নিবন্ধটি টেকক্রাঞ্চের সম্পাদকীয় নয়; এটি লিথিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বো জিয়াং-এর লেখা একটি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত বিশ্লেষণ।
কার্ড সংযুক্তকরণ কেন ঝুঁকিপূর্ণ
সাধারণ ব্যবহারকারীর সুবিধার জন্য এই প্রক্রিয়াটি দ্রুত ও সহজ করা হয়েছে। একজন গ্রাহক যখন নিজের কার্ড মোবাইল মানিব্যাগে যুক্ত করেন, তখন সাধারণত একটি পরিচয় যাচাইয়ের ধাপ সম্পন্ন করলেই কাজ শেষ হয়ে যায়। প্রতারকেরা ঠিক এই ধাপকেই লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।
তারা ইন্টারনেটভিত্তিক কেনাকাটার তথ্যচুরি থেকে পাওয়া কার্ডের তথ্য ব্যবহার করে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রে সেই কার্ড যুক্ত করার চেষ্টা করে। কখনও স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে, আবার কখনও গ্রাহকসেবা কর্মকর্তাকে প্রতারণার মাধ্যমে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করে।
আরেকটি পরিচিত কৌশল হলো ভুয়া বার্তা বা ভুয়া ওয়েবসাইটের মাধ্যমে গ্রাহকের কাছ থেকে কার্ডের তথ্য কিংবা একবার ব্যবহারযোগ্য গোপন সংকেত সংগ্রহ করা।
কিছু ক্ষেত্রে প্রতারকদের এমনকি পরিচয় যাচাইয়ের ধাপও অতিক্রম করতে হয় না। যদি কোনো কার্ডকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে মূল্যায়ন করা হয়, তাহলে সেটি অতিরিক্ত যাচাই ছাড়াই মোবাইল মানিব্যাগে যুক্ত হয়ে যেতে পারে। চুরি করা তথ্য যথেষ্ট বিশ্বাসযোগ্য হলে প্রতারকেরাও এই সুযোগ নিতে পারে।
একবার কার্ড যুক্ত হয়ে গেলে কী হয়
চুরি করা কার্ড সফলভাবে মোবাইল মানিব্যাগে যুক্ত হয়ে গেলে সেটি পরবর্তী সব ব্যবস্থার কাছে বৈধ কার্ড হিসেবেই গণ্য হয়।
এর ফলে সেই কার্ড দিয়ে করা লেনদেন বাস্তবে দোকানে কার্ড স্পর্শ করে অর্থ পরিশোধের সমমান হিসেবে বিবেচিত হয়। এমন পরিস্থিতিতে কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের পক্ষে অনেক সময় লেনদেন বাতিল করা বা অর্থ ফেরত পাওয়ার সুযোগ থাকে না।
শুধু আর্থিক ক্ষতিই নয়, গ্রাহকের আস্থাও নষ্ট হতে পারে। অনেক গ্রাহক পরে অন্য প্রতিষ্ঠানে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
বর্তমান ব্যবস্থার দুর্বলতা
একটি কার্ড মোবাইল মানিব্যাগে যুক্ত হওয়ার সময় বিভিন্ন পক্ষ একসঙ্গে কাজ করে। এর মধ্যে রয়েছে মোবাইল মানিব্যাগ সেবাদাতা, কার্ড নেটওয়ার্ক এবং কার্ড প্রদানকারী ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান।
সমস্যা হলো, এতদিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের মূল দায়িত্ব ছিল কার্ড নেটওয়ার্ক ও প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠানের হাতে। অথচ গ্রাহক সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি তথ্য থাকে কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কাছেই। অনেক সময় তারা পুরো ঘটনা জানতে পারে কাজ শেষ হওয়ার পর। এ কারণে গুরুত্বপূর্ণ ঝুঁকির তথ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণে ব্যবহার করা সম্ভব হয় না।
লিথিকের নতুন সমাধান
এই সমস্যার সমাধানে লিথিক নতুন একটি ব্যবস্থা চালু করেছে, যার মাধ্যমে কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান তাৎক্ষণিকভাবে কার্ড সংযুক্ত করার অনুরোধ যাচাই করতে পারে।
এখানে গ্রাহকের যন্ত্র ব্যবহারের ইতিহাস, আচরণগত ধরণ এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই ব্যবস্থা তৈরিতে বিশ্বব্যাপী কার্ড লেনদেন ব্যবস্থার অন্যতম প্রতিষ্ঠান মাস্টারকার্ডের জালিয়াতি শনাক্তকরণ প্রযুক্তিও যুক্ত করা হয়েছে। প্রথমে এই প্রযুক্তি ব্যবহার শুরু করে মার্কিন ডিজিটাল ব্যাংক মার্কারি, যারা বছরে প্রায় আড়াইশ বিলিয়ন ডলারের লেনদেন পরিচালনা করে।
যেভাবে কাজ করে
কোনো ব্যবহারকারী যখন মোবাইল মানিব্যাগে কার্ড যুক্ত করতে চান, তখন অনুরোধটি প্রথমে লিথিকের নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে যায়। সবকিছু মিলিসেকেন্ডের মধ্যেই সম্পন্ন হয়।
প্রাথমিক যাচাইয়ে উত্তীর্ণ হলে অনুরোধটি কার্ড প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থায় পাঠানো হয়। সেখানে তারা কার্ড অনুমোদন, বাতিল অথবা অতিরিক্ত পরিচয় যাচাইয়ের নির্দেশ দিতে পারে।
প্রয়োজনে খুদে বার্তা, ইলেকট্রনিক ডাক অথবা প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব প্রয়োগের মাধ্যমে দ্বিস্তরীয় পরিচয় যাচাই চালু করা যায়। বিশেষ করে নিজস্ব প্রয়োগের মাধ্যমে যাচাই প্রতারকদের জন্য আরও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।

সমন্বিত নিরাপত্তাই ভবিষ্যৎ
লেখকের মতে, নিরাপদ অর্থপ্রদানের জন্য সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাইল মানিব্যাগ সেবাদাতা, কার্ড নেটওয়ার্ক, প্রক্রিয়াকরণ প্রতিষ্ঠান এবং কার্ড প্রদানকারী—সবার তথ্য একসঙ্গে ব্যবহার করতে পারলেই প্রতারণা আরও কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
ডিজিটাল মানিব্যাগের ব্যবহার যত বাড়বে, প্রতারণার কৌশলও তত পরিবর্তিত হবে। তাই সমস্যার বিস্তার ঘটার আগেই নতুন নিরাপত্তা স্তর তৈরি করা জরুরি।
লিথিকের দাবি, তাদের নতুন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যবস্থা সেই নতুন নিরাপত্তা স্তর তৈরি করার লক্ষ্যেই নির্মিত হয়েছে, যাতে কার্ড সংযুক্ত করার মুহূর্ত থেকেই প্রতারণা ঠেকানো যায়।






