দরকারি

ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতায় ফিরছে স্মৃতি, বাস্তব জীবনে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে প্রবীণরা

Rate this post

বার্ধক্য অনেক সময় মানুষকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে চার দেয়ালের ভেতর। দূরভ্রমণ, দুঃসাহসিক অভিজ্ঞতা কিংবা নতুন জায়গা দেখার স্বপ্ন ধীরে ধীরে জায়গা করে নেয় স্মৃতির ভাঁজে। যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়ার লস গ্যাটোসে অবস্থিত অবসরজীবীদের আবাসন কেন্দ্র ‘দ্য টেরেসেস’-এর বাসিন্দারাও এর ব্যতিক্রম নন। আশির কোঠা পেরোনো এই মানুষগুলোর অনেকেই আর দীর্ঘ ভ্রমণ কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ অভিযানে যেতে পারেন না। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে তাঁদের সামনে খুলে গেছে এক নতুন জানালা ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি (ভিআর)।

কখনো ইউরোপের রাস্তায় হাঁটা, কখনো সাগরের গভীরে ডলফিনের সঙ্গে সাঁতার, আবার কখনো আকাশে ভেসে বেড়ানো হ্যাং-গ্লাইডিং সবই সম্ভব হচ্ছে ভিআর হেডসেটের মাধ্যমে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই বাসিন্দারা যেন ফিরে যাচ্ছেন তাঁদের তারুণ্যের দিনগুলোতে। এসব অভিজ্ঞতা আয়োজন করছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান রেনডেভার, যারা প্রযুক্তিকে নিঃসঙ্গতার মাধ্যম না বানিয়ে প্রবীণদের মানসিক সুস্থতা ও সামাজিক যোগাযোগের সেতুতে রূপ দিয়েছে।

চলতি বছরের শুরুতে দ্য টেরেসেসে আয়োজিত এক ভিআর সেশনে অংশ নিয়ে ৮১ বছর বয়সী জিনি বেয়ার্ড ডলফিনের সঙ্গে সাঁতারের অভিজ্ঞতা নিতে নিতে হাত-পা নেড়েছেন চেয়ারে বসেই। সেশন শেষে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে তিনি বলেন, “আমরা পানির নিচে গিয়েছিলাম, অথচ দমও ধরে রাখতে হয়নি!” কারও মুখে বিস্ময়ের হাঁ, কারও আবার ভয় মেশানো আনন্দ—প্রবীণদের প্রতিক্রিয়ায় ভিআর হয়ে উঠেছে অনুভূতির নতুন ভাষা।

রেনডেভারের ভিআর প্রোগ্রামের বিশেষত্ব হলো স্মৃতির সঙ্গে সংযোগ। প্রযুক্তির মাধ্যমে অনেক প্রবীণকে ফিরিয়ে নেওয়া হচ্ছে তাঁদের শৈশবের পাড়া, পুরোনো বাড়ি কিংবা বহু বছর আগে ছেড়ে আসা শহরে। নিউইয়র্কের কুইন্সে নিজের শৈশবের পাড়ায় ভার্চ্যুয়ালি ফিরে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন ৮৪ বছর বয়সী সু লিভিংস্টোন। তাঁর ভাষায়, “এটা শুধু আবার দেখা নয়, বরং সব স্মৃতি ফিরে আসার অনুভূতি।”

ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতায় ফিরছে স্মৃতি, বাস্তব জীবনে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে প্রবীণরা
ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতায় ফিরছে স্মৃতি, বাস্তব জীবনে ঘনিষ্ঠ হচ্ছে প্রবীণরা

দ্য টেরেসেসের কমিউনিটি লাইফ ডিরেক্টর অ্যাড্রিয়ান মার্শাল বলেন, একজন বাসিন্দা ভিআরের অভিজ্ঞতা নেওয়ার পর অন্যদের মধ্যেও কৌতূহল তৈরি হয়। এমনকি নিয়মিত বোর্ড গেম খেলতে ব্যস্ত থাকা মানুষজনও ভিআর সেশন মিস করতে চান না। তাঁর মতে, এই অভিজ্ঞতা প্রবীণদের মধ্যে আলাপচারিতার সূত্র তৈরি করে এবং পারস্পরিক সম্পর্ক গভীর করে।

রেনডেভার বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার প্রায় ৮০০টি প্রবীণ আবাসনে তাদের সেবা দিচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ থেকে প্রায় ৪৫ লাখ ডলারের একটি গবেষণা অনুদান পেয়েছে। লক্ষ্য—ঘরে থাকা প্রবীণ ও তাঁদের পরিচর্যাকারীদের সামাজিক বিচ্ছিন্নতা কীভাবে কমানো যায়, তা খতিয়ে দেখা।

গবেষকেরা বলছেন, সীমিত ও উদ্দেশ্যপূর্ণ ব্যবহারে ভিআর প্রবীণদের স্মৃতিশক্তি, মানসিক সক্রিয়তা এবং সামাজিক সংযোগ বাড়াতে সহায়ক হতে পারে। তবে এটি যেন অন্য সামাজিক কার্যক্রমের বিকল্প না হয়ে পরিপূরক হয়—সে বিষয়েও সতর্ক করছেন বিশেষজ্ঞরা।

কানাডার শেরিডান কলেজের নিউরোসাইকোলজিস্ট ক্যাথরিন ডুপুইস বলেন, “অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইমের ঝুঁকি আছে। তবে অর্থপূর্ণভাবে ব্যবহার করলে ভিআর প্রবীণদের জন্য বিস্ময় ও সংযোগের সুযোগ তৈরি করতে পারে।”

ডিমেনশিয়ায় আক্রান্ত প্রবীণদের ক্ষেত্রেও ভিআর আশার আলো দেখাচ্ছে। ক্যালিফোর্নিয়ার আরেক অবসরজীবী আবাসন ‘দ্য ফোরাম’-এ ভিআরের মাধ্যমে স্মৃতির ছোঁয়া পাচ্ছেন ৮৩ বছর বয়সী বব রোগালো। গ্লেসিয়ার ন্যাশনাল পার্কে ভার্চ্যুয়াল ভ্রমণে গিয়ে হাসি আর মাথা নাড়ার মধ্যেই প্রকাশ পাচ্ছিল তাঁর আনন্দ যা তাঁর স্ত্রী সাল্লি রোগালোর কাছে ছিল বহু পুরোনো স্মৃতির পুনরুজ্জীবন।

প্রযুক্তির এই নতুন ব্যবহার প্রমাণ করছে বার্ধক্য মানেই জীবনের রং ফিকে হয়ে যাওয়া নয়। ভার্চ্যুয়াল বাস্তবতার হাত ধরে প্রবীণরা শুধু অতীতে ফিরছেন না, বাস্তব জীবনেও একে অন্যের আরও কাছাকাছি আসছেন।

 

Related Articles

Back to top button