রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি করলেও, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে রাশিয়া
রাশিয়ার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার দাবি করলেও, তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করেছে রাশিয়া। ইসরায়েলভিত্তিক ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তি নির্মাতা সেলেব্রাইট দাবি করেছিল যে তারা ২০২১ সালে রাশিয়ার সরকারি সংস্থাগুলোর সঙ্গে সব ধরনের ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু নতুন এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সেই ঘোষণার পরও রুশ কর্তৃপক্ষ তাদের প্রযুক্তি ব্যবহার করে এক বিরোধী রাজনীতিকের আইফোনে প্রবেশ করেছিল।

কানাডার টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক ডিজিটাল অধিকার গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিটিজেন ল্যাব জানিয়েছে, তারা এমন প্রমাণ পেয়েছে যা দেখায় যে ২০২১ সালের জুন মাসে রুশ তদন্তকারীরা সেলেব্রাইটের ফোন-ভাঙার প্রযুক্তি ব্যবহার করে মানবাধিকারকর্মী ও বিরোধী রাজনীতিক আন্দ্রেই পিভোভারভের আইফোনে প্রবেশ করে।
ঘটনাটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর তিন মাস আগেই সেলেব্রাইট ঘোষণা দিয়েছিল যে তারা রাশিয়ার সরকারি গ্রাহকদের কাছে আর কোনো প্রযুক্তি বিক্রি করবে না। প্রতিষ্ঠানটি আরও বলেছিল, প্রয়োজনে তারা দূর থেকে যন্ত্র নিষ্ক্রিয় করতে পারে এবং সফটওয়্যার হালনাগাদ বন্ধ করে দিতে পারে।
কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
গবেষকদের মতে, এই ঘটনা দেখিয়ে দেয় যে একবার কোনো নজরদারি বা অনুপ্রবেশ প্রযুক্তি কোনো রাষ্ট্র বা সংস্থার হাতে পৌঁছে গেলে সেটির ব্যবহার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। ব্যবসায়িক সম্পর্ক শেষ হয়ে গেলেও প্রযুক্তি থেকে যায়, আর সেটির অপব্যবহারও চলতে পারে।
ইসরায়েলি মানবাধিকার আইনজীবী ইতাই ম্যাক দীর্ঘদিন ধরে নজরদারি প্রযুক্তি শিল্পের সমালোচনা করে আসছেন। তার মতে, বিক্রি বন্ধ করা বা সফটওয়্যার লাইসেন্স বাতিল করা যথেষ্ট নয়। যদি পুরোনো গ্রাহকের কাছ থেকে যন্ত্রগুলো ফিরিয়ে নেওয়া না হয় বা ধ্বংস না করা হয়, তাহলে সেগুলো ভবিষ্যতেও অপব্যবহার করা সম্ভব।
সিটিজেন ল্যাবের জ্যেষ্ঠ গবেষক জন স্কট-রেইলটন বলেন, সেলেব্রাইটের উচিত ছিল অপব্যবহারের বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া গেলে দূর থেকে তাদের যন্ত্র অচল করে দেওয়া। পাশাপাশি প্রতিটি তথ্য-উদ্ধার কার্যক্রমে এমন ডিজিটাল স্বাক্ষর যুক্ত করা উচিত, যাতে পরে বোঝা যায় কোন যন্ত্র ব্যবহার করে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছিল।
সেলেব্রাইট মূলত এমন হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার তৈরি করে যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোবাইল ফোন আনলক ও তথ্য উদ্ধার করতে ব্যবহার করে। অতীতে হংকং, কেনিয়া, জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক ও বিরোধী মতাবলম্বীদের বিরুদ্ধে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
এসব ঘটনার পর প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশ, চীন, হংকং, মিয়ানমার এবং সার্বিয়ার সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছিল।
সেলেব্রাইটের প্রধান বিপণন কর্মকর্তা ডেভিড গি এক বিবৃতিতে বলেন, ২০২১ সালের মার্চে রাশিয়ার সঙ্গে সব বিক্রয় ও সেবা কার্যক্রম বন্ধ করা হয়েছিল এবং বিদ্যমান লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছিল। তার ভাষায়, ওই সময়ের পর রাশিয়ায় সেলেব্রাইটের কোনো যন্ত্র ব্যবহৃত হয়ে থাকলে তা সম্পূর্ণ অননুমোদিত।
তবে প্রতিষ্ঠানটি ব্যাখ্যা করতে পারেনি কীভাবে তাদের প্রযুক্তি এরপরও ব্যবহৃত হলো।
আন্দ্রেই পিভোভারভের মামলায় গবেষকেরা তার ফোনে এমন ফরেনসিক চিহ্ন খুঁজে পান যা সেলেব্রাইটের ইউএফইডি প্রযুক্তি ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়। পিভোভারভ একটি আদালতের নথিও গবেষকদের দেন, যেখানে রুশ বিশেষজ্ঞ কেন্দ্র স্পষ্টভাবে উল্লেখ করে যে তারা ইউএফইডি ব্যবহার করে তার ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রাম বার্তাসহ বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করেছে।
তদন্তকারীরা তার ফোনে রাজনৈতিক শব্দ, বিরোধী নেতাদের নাম এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক যোগাযোগও অনুসন্ধান করেছিল।

পিভোভারভ তখন ওপেন রাশিয়া নামের একটি বিরোধী সংগঠনের পরিচালক ছিলেন। পরে তাকে চার বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ২০২৪ সালে রাশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে বন্দি বিনিময় চুক্তির অংশ হিসেবে তিনি মুক্তি পান।
এই ঘটনা আবারও প্রশ্ন তুলেছে—প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো কি সত্যিই নিশ্চিত করতে পারে যে তাদের শক্তিশালী নজরদারি ও অনুপ্রবেশ প্রযুক্তি ভুল হাতে গিয়ে অপব্যবহৃত হবে না? সেলেব্রাইটের এই উদাহরণ অন্তত দেখাচ্ছে, একবার প্রযুক্তি ছড়িয়ে পড়লে সেটিকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা প্রায় অসম্ভব।






